ফল ধরার মুহূর্তে চোখের সামনে কেটে সাফ করে দেওয়া হলো আট বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ১,২০০টি ফলন্ত কমলা গাছ। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এখন সেই ধ্বংসস্তূপে বসে আহাজারি করছেন ভুক্তভোগী নারী সালমা বেগম। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন কালিঞ্জি এলাকায় বন বিভাগের পরিচালিত একটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এই চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা ও চাঁদা দিয়ে দীর্ঘ আট বছর ধরে তারা এই বাগান লালন-পালন করে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি এনজিওর কিস্তি ও আর্থিক সংকটের কারণে চাঁদার টাকা দিতে বিলম্ব হওয়ায় সম্পূর্ণ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বন বিভাগ এই ফলন্ত বাগান কেটে ধ্বংস করেছে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে ভুক্তভোগী সালমা বেগম বলেন, “এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবং দিনরাত এক করে আমরা ১,২০০টি কমলা গাছ বড় করেছিলাম। এবার গাছে প্রচুর ফল এসেছিল, কয়েকদিন পরেই বিক্রি শুরু হতো। আট বছর ধরে বন বিভাগকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে এসেছি। কিন্তু এক কিস্তির টাকা দিতে দেরি হতেই তারা আমাদের পুরো ভবিষ্যৎ শেষ করে দিল! এখন আমি ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব? আমার সংসার কীভাবে চলবে?”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সংরক্ষিত বনের জমিতে ইতিপূর্বে চারা রোপণের সময় কিংবা গাছগুলো ছোট থাকা অবস্থায় বন বিভাগকে কোনো কঠোর ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, মাসোহারা পাওয়ালগ্নে বাগানকে ‘নিরাপদ’ মনে করা হলেও চাঁদার লেনদেনে ছেদ পড়তেই তা হুট করে ‘অবৈধ দখল’ হিসেবে গণ্য হয় এবং প্রশাসনিক বুলডোজার চালানো হয়।
পরিবেশবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, The Forest Act, 1927 অনুযায়ী অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও মামলা করার এখতিয়ার বন বিভাগের রয়েছে। কিন্তু ফলন্ত গাছ এভাবে কেটে ধ্বংস করার সরাসরি কোনো ক্ষমতা আইন কর্মকর্তা বা ভ্রাম্যমাণ আদালতকে দেয় না। গাছ একবার মাটিতে জন্ম নিলে তা রাষ্ট্রীয় ও পরিবেশগত সম্পদে পরিণত হয়। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন বা আদালতের রায় ছাড়া ফলন্ত গাছ নিধন করা আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির শামিল।
গাছগুলো যদি অবৈধ জমিতেও হয়ে থাকে, তবে তা সরকারি হেফাজতে নিয়ে নিলাম বা ব্যবস্থাপনার সুযোগ ছিল। তা না করে ফল আসার মুহূর্তে একসাথে ১,২০০টি সবুজ ও সতেজ ফলজ গাছ কেটে ফেলাকে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহল বন বিভাগের চরম হঠকারিতা ও প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
তবে স্থানীয় বন বিভাগের পক্ষ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, সংরক্ষিত বনের জমি দখলমুক্ত করতেই এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, একজন নিঃস্ব নারীর এনজিওর ঋণের ভার এবং ১,২০০টি ফলন্ত কমলা গাছ নিধনের ঘটনা স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী সালমা বেগম ও এলাকাবাসী এই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অসাধু কর্মকর্তাদের বিচার দাবি করেছেন।