
আবেগের এক অনন্য ক্যানভাস
একটি বিদায় মানেই কি কেবল বিচ্ছেদ? নাকি একটি বিদায় হতে পারে কোনো এক মহৎ জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তির মুহূর্ত? কমলগঞ্জ সরকারি বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের আঙিনায় শনিবার দুপুরে যে দৃশ্যের অবতারণা হলো, তা কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না; বরং তা ছিল গুরু-শিষ্যের অমর সম্পর্কের এক জীবন্ত মহাকাব্য। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবসরে যাওয়া প্রিয় শিক্ষক কৃষ্ণ কুমার সিংহকে বিদায় জানাতে গিয়ে যেন সময়ের চাকা উল্টো ঘুরে ফিরে গিয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সেদিনকার কিশোর ছাত্ররা আজ প্রতিষ্ঠিত নাগরিক, কেউ ব্যাংকার, কেউ সাংবাদিক, কেউবা সফল ব্যবসায়ী—কিন্তু প্রিয় শিক্ষকের সামনে তারা সেই আগের মতোই অনুগত ছাত্র।
স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধার মহোৎসব:
বিদ্যালয় মিলনায়তনে আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই ছিল আবেগের ঘনঘটা। ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যাওয়া এই সিনিয়র সহকারী শিক্ষককে সম্মান জানাতে বিদ্যালয়ের ‘৯৮ ব্যাচ’-এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আয়োজন করে এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্যাংকার খন্দকার আনোয়ার মাসুম।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষকতা জীবনের মহত্ত্ব তুলে ধরেন কমলগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মুমিন, ভান্ডারীগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশেদ আলী, শ্রীমঙ্গল জনতা ব্যাংকের ম্যানেজার মো. সালাহ উদ্দিন, সাবেক প্রধান শিক্ষক রনেন্দ্র কুমার দেব এবং কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি আসহাবুজ্জামান শাওন।
বক্তাদের কণ্ঠে আদর্শের প্রতিচ্ছবি:
স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে ৯৮ ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্র ও প্রেসক্লাব সম্পাদক আহমেদুজামান আলম, শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান এবং রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী মাহফুজ আহমেদ আজাদসহ অন্য শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তারা বলেন, “কৃষ্ণ কুমার স্যার কেবল আমাদের পাঠ্যবইয়ের অক্ষর চেনাননি, তিনি আমাদের জীবনের মানচিত্র আঁকতে শিখিয়েছেন। আজ আমরা সমাজে যে অবস্থানেই থাকি না কেন, তার পেছনে স্যারের শাসন আর স্নেহের অবদান অনস্বীকার্য।” আলোচনা সভা শেষে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রিয় শিক্ষককে মানপত্র, সম্মাননা ক্রেস্ট এবং বিশেষ উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। এ সময় পুরো মিলনায়তনে এক পিনপতন নীরবতা ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বীরের বেশে প্রস্থান: রাজকীয় আয়োজন:
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে স্মরণীয় ও আলোচিত অংশটি ছিল সংবর্ধনা পরবর্তী বিদায়ী যাত্রা। প্রথাগত বিদায় অনুষ্ঠান শেষে যখন শিক্ষক কৃষ্ণ কুমার সিংহ স্কুল ত্যাগ করছিলেন, তখন তাকে চমকে দেয় তার প্রিয় ছাত্ররা। বিদ্যালয়ের বিএনসিসি (BNCC) ক্যাডেটদের একটি সুসজ্জিত দল তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। একজন শিক্ষকের জন্য এমন সামরিক মর্যাদার সম্মাননা সচরাচর দেখা যায় না।
এরপর শিক্ষককে বসানো হয় বর্ণিল ফুলে সাজানো একটি খোলা জিপ গাড়িতে। শত শত শিক্ষার্থীর মোটরসাইকেল বহর ও স্লোগানের মধ্য দিয়ে এক রাজকীয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে বিদ্যালয় থেকে তার নিজ বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ এই দৃশ্য উপভোগ করেন এবং শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষক-ভক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শেষ কথা:
শিক্ষক কৃষ্ণ কুমার সিংহ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু হতে পারে না। আমি আমার ছাত্রদের মাঝে আজীবন বেঁচে থাকতে চাই।” কমলগঞ্জের এই ঘটনাটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে।