মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে বেগম খালেদা রব্বানীর নাম অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি কেবল একজন সফল রাজনীতিবিদই নন, বরং এই অঞ্চলে নারীদের সংগঠিত ও স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক আলোকবর্তিকা। এক সময়ের ‘অবরোধবাসিনী’ অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যেভাবে নিজেকে জাতীয় রাজনীতির প্রথম সারিতে নিয়ে গেছেন, তা সমকালীন ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সত্তরের দশকে খালেদা রব্বানী মূলত মহিলা সমিতির সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে নারীদের জনসম্মুখে আসার সুযোগ ছিল সীমিত। তবে তাঁর পরিবারের প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কারণে মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে তাঁর এক ধরনের সংযোগ তৈরি হয়।
সেই সময়ে মৌলভীবাজারে একটি চাঞ্চল্যকর নারী নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতাকর্মী, বিশেষ করে পরবর্তীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমদ এবং ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন জেলা সভাপতি মসুদ আহমদ একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নারী নেতৃত্বের সন্ধান করছিলেন। তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান সাজ্জাদুর রহমান পুতুলের কার্যালয়ে একাধিক বৈঠকের পর সর্বসম্মতিক্রমে বেগম খালেদা রব্বানীকে আহ্বায়ক এবং মসুদ আহমদকে সদস্য সচিব করে গঠন করা হয় ‘মৌলভীবাজার নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’। তৎকালীন ঢাকার প্রেক্ষাপটের চেয়েও অগ্রসর এই সামাজিক আন্দোলনই মূলত খালেদা রব্বানীকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে।
সামাজিক কাজের মাধ্যমে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সত্তরের দশকের শেষের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মৌলভীবাজার সফরে এলে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। তৎকালীন সময়ে অ্যাডভোকেট সাইয়েদ আব্দুল মতিন, মঈন উল ইসলাম, আবদুল খালিকসহ স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের হাত ধরে মৌলভীবাজারে ‘জাগদল’ (জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে খালেদা রব্বানীও এই ধারার সঙ্গে যুক্ত হন।
পরবর্তীতে জাগদল যখন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-তে রূপান্তরিত হয়, তখন তিনি দ্রুতই তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দেন। দল তাঁকে কেন্দ্রীয় মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয় এবং তিনি একাধিকবার সংরক্ষিত নারী আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিভিন্ন বিদেশ সফরেও তিনি সঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও জনকল্যাণমূলক জীবনের পর বেগম খালেদা রব্বানী বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি মৌলভীবাজার শহরের শাহমোস্তফা রোডস্থ নিজ বাসভবনে চিকিৎসাধীন।
গতকাল মৌলভীবাজারে সরকারি কর্মসূচি শেষ করে প্রবীণ এই নেত্রীর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে তাঁর বাসভবনে যান বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী তাঁর শয্যাপাশে কিছু সময় কাটান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেগম খালেদা রব্বানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, দলীয় অবদান এবং দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং তাঁর দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করেন।
একজন সাধারণ সামাজিক কর্মী থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর যে ত্যাগ ও সাহসিকতার গল্প, বেগম খালেদা রব্বানী তারই জীবন্ত প্রতীক। মৌলভীবাজারের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পাতায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।