মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ
প্রচারের চাকচিক্য নেই, নেই কোনো আত্মপ্রচারের মোহ। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে কেবল আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দেওয়াই যেন তাদের নেশা। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার এক নিভৃত পল্লীর ‘ছলিম বাড়ি’ আজ এলাকার অসহায় মানুষের কাছে এক পরম নির্ভরতার নাম। মরহুম ছলিম উল্লার সুযোগ্য উত্তরসূরিরা তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য আর মানবিক মূল্যবোধকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন সেবার এক অনন্য নজির।
একটি সমাজকে বদলে দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার শিক্ষা—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে এই পরিবারটি এলাকায় গড়ে তুলেছে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত মবশ্বির আলী চৌধুরী বালক উচ্চ বিদ্যালয় আজ অত্র অঞ্চলের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি কোরআনের হাফেজ তৈরির লক্ষ্যে তারা পরিচালনা করছেন মবশ্বির আলী জাহানারা চৌধুরী হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং ইবাদতের জন্য নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন ছলিমউল্লা বাজার জামে মসজিদ।
সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজের পাশাপাশি ঋতুভিত্তিক সংকটে এই পরিবারটি অভাবী মানুষের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর শীতকালীন ভয়াবহ শৈত্যপ্রবাহে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন এই পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকার চা-শ্রমিক, ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র মানুষের মাঝে উন্নতমানের কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।
এছাড়া পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে তাদের সেবামূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। রমজান শুরুর আগেই এলাকার শত শত অসহায় পরিবারের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয় মাসব্যাপী ইফতার ও সেহরি সামগ্রী। “রমজানে যেন কেউ অভুক্ত না থাকে”—এই লক্ষ্য নিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তারা এই খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
পারিবারিকভাবে পরিচালিত ‘মবশ্বির আলী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এখন অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। এই ট্রাস্টের অধীনে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে:
বর্তমানে যখন সামান্য সাহায্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের হিড়িক পড়ে, সেখানে এই পরিবারটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাস করেন, “মানবসেবা কোনো প্রদর্শনের বিষয় নয়, এটি একটি দায়িত্ব ও নেশা।” কোনো ধরনের লোকদেখানো আয়োজন ছাড়াই রাতের আঁধারে তারা ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দেন দুর্গতদের ঘরে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ছলিম বাড়ির এই উত্তরসূরিরা আমাদের সমাজের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়রা জানান, শীতের কাপড় থেকে শুরু করে রমজানের বাজার—সবক্ষেত্রেই এই পরিবারের অবদান অতুলনীয়। তারা মানুষের কল্যাণে কাজ করেন কিন্তু কোনো দিন সেটার প্রতিদান বা প্রচার চান না।
উপসংহার:
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের এই প্রচারবিমুখ পরিবারটি প্রমাণ করেছে, মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য উচ্চকণ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন নেই; সুন্দর একটা মন আর নিঃস্বার্থ ইচ্ছাই যথেষ্ট। তাদের এই সেবার ধারা অব্যাহত থাকুক এবং সমাজের অন্য সামর্থ্যবানদের জন্য এটি এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠুক—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।