নিজস্ব প্রতিবেদক | জনস্বার্থ ডেস্ক
তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের উন্নয়ন ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ইউনিয়ন পরিষদ। স্থানীয় সরকারের এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি দলীয় প্রভাব ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকলে একজন চেয়ারম্যানের পক্ষে সাধারণ মানুষকে ৮৩টিরও বেশি সেবা প্রদান করা সম্ভব। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, তবে গ্রাম হবে শহর—এই স্লোগান বাস্তবায়ন করা কেবল সময়ের ব্যাপার। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ যে সকল সেবা পেতে পারেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
দরিদ্র ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১১টিরও বেশি ভাতার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতা। এছাড়া দুস্থ মহিলা ভাতা, ভিজিডি (VGD), ভিজিএফ (VGF) এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। শিশু সহায়তা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা নিশ্চিত করাও পরিষদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
একটি ইউনিয়নের প্রাণ হলো তার রাস্তাঘাট। কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) ও কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা)-সহ ১০০ দিনের কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার সম্ভব। এছাড়া ব্রিজ, কালভার্ট, ড্রেন নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূর করা যায়। হাট-বাজার ও ঘাটের উন্নয়ন গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
বেকারত্ব দূর করতে দরিদ্রদের কর্মসংস্থান প্রকল্প, মৌসুমি কর্মসংস্থান এবং যুব কর্মসংস্থান সহায়তার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। শ্রমিক নিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমেও স্থানীয় দরিদ্র মানুষের আয়ের পথ সুগম করা সম্ভব।
নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার জন্য টিউবওয়েল স্থাপন, গভীর নলকূপ বসানো এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন বিতরণ পরিষদের নিয়মিত কাজের অংশ। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ইউনিয়ন গড়ে তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্যখাতে কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষা, টিকাদান কর্মসূচি এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষা সহায়তা, উপবৃত্তি ও স্কুল মেরামতের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। কৃষকদের জন্য কৃষি প্রশিক্ষণ, উন্নত মানের বীজ ও সার সহায়তা এবং সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা ইউনিয়নের অন্যতম সেবা। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ, বনায়ন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নেও ব্যাপক বরাদ্দ থাকে।
বর্তমানে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ এবং অনলাইনের যাবতীয় সেবা অতি দ্রুত পাওয়া সম্ভব। এর ফলে জনগণকে এখন আর জেলা বা উপজেলা সদরে দৌড়াতে হয় না।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ক্ষমতায়ন, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং সচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে ইউনিয়ন পরিষদ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প পরিচালনার গুরুদায়িত্ব চেয়ারম্যানের ওপর ন্যস্ত।
বিশ্লেষকদের অভিমত: তৃণমূলের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যদি দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটে, তবে সাধারণ মানুষের কপালে জোটে শুধু হয়রানি। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি স্থানীয় এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়, তবেই প্রতিটি ইউনিয়ন হবে আদর্শ ও স্বনির্ভর। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই সেবাগুলো পাওয়া কোনো দয়া নয়, বরং নাগরিকের আইনগত অধিকার।